শাবলু শাহাবউদ্দিনের গল্প: পরিবর্তন

3
Advertisement

শাবলু শাহাবউদ্দিনের গল্প: পরিবর্তন

পরিবর্তন

                                     শাবলু শাহাবউদ্দিন                                    

শাবলু শাহাবউদ্দিনের গল্প: পরিবর্তন

দেশে পরিবর্তন এসেছে। এসেছে পরিবর্তন মানুষের জীবনে। সমাজ পাল্টে গেছে। পাল্টে গেছে মানুষের জীবন। কত রং বেরঙের পরিবর্তন চারিদিকে। যার হিসাব করা কঠিন। শুধুই কঠিন না। যার হিসাব এখন আর কেউ করতেই চায় না। মুনীর চৌধুরীর ভাষায় বলতে হয়, ‘মানুষ মরে গেলে পচে যায়, বেঁচে থাকলে বদলায়, কারণে অকারণে বদলায়।’ আসলে এই রঙিন দুনিয়ায় আমিও যে বদলে যেতে পারি, এ কথা ভুলেও কখনো ভাবিনি। সরল বিশ্বাস ছিল; আমি একদিন ফিরে আসবোই। কিন্তু কোনোদিন আমার আর ফিরে আসা হলো না। রঙিন দুনিয়ায় আমিও রঙিন হয়ে ভুলেই গেছিলাম রুনা নামের কোনো এক মেয়ের অস্তিত্ব আমার জীবনে কোনো একসময় ছিল।



আমার সাথেই মেয়েটি পড়াশোনা করতো। ক্লাস ওয়ান থেকে এসএসসি পর্যন্ত, পরে ওর আর পড়াশোনা করা হলো না। মেয়েটির আগ্রহ থাকলেও সে আর পড়াশোনা করতে পারলো না। তিনমাইল হেঁটে এসে বদর মাঝির ঘাট। ঘাট পার হয়ে ভ্যানে করে আরো মাইল পাঁচেক পাড়ি দিয়ে তবেই পেতাম একটা লক্কর-ঝক্কর মার্কা ছেঁড়া টিনের হাইস্কুল ঘর। এখান থেকেই আশেপাশের পনেরো থেকে বিশ গ্রামের ছেলেমেয়েরা এসএসসি পাশ করে। কলেজে পড়তে হলে সেই জেলা শহর ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তাই এসএসসি পাশের পর শতকরা প্রায় আশি থেকে নব্বই জন ছেলেমেয়ের পড়াশোনা থেমে যায়। অর্থাৎ এক থেকে দুইজন ছেলের কপালে জুটতো শহরের পড়াশোনা। আমার ব্যাচের একমাত্র আমিই কেবল কলেজে ভর্তি হওয়ার দুর্দান্ত সাহস যোগাড় করতে পেরেছিলাম। সেটা অবশ্য আমার সাহস বললে ভুল হবে। সাহসটা ছিল রুনার। আমার যাবতীয় খরচ বহন করতো মেয়েটি। আমাকে ভালোবাসার জন্য কত যে গঞ্জনা মেয়েটি সহ্য করেছে। সেটা ঈশ্বর ছাড়া আর কেউ জানে না। কখনো মুখ  দিয়ে উচ্চারণও করেনি। কারণ, আমি জানলে কষ্ট পাবো বলে। যাইহোক কোনো এক সময় রুনার মা-বাবা আমাকে মেনে নেয়। রুনা খরচ দিলেও মাঝে মাঝে রুনার মা আমাকে খরচ পাঠাতো কাউকে না জানিয়ে, খুব গোপনে। আমিও চরম কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতাম। এইচএসসি পাশের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। জীবনে চলে আসে পরিবর্তন। সাদাকালো পৃথিবী হয়ে যায় রঙিন। আসমানি পর্দা নীল থেকে হয়ে যায় লাল। পৃথিবীর লোভ-লালসায় আমি মেতে উঠি। ভুলে যাই অতীত। হৃদয়ে ধারণ করা রুনা নামের স্মৃতির পাতার পর্দায় আধুনিকতার কালো ধুলো পড়ে আমার জীবন থেকে হারিয়ে যায় গ্রামের সহজ সরল মেয়ে রুনা। রুনার জায়গায় জায়গা করে নেয় ঢাকা শহরের আলট্রা মডার্ন বড়লোকের মেয়ে ছলনাময়ী কল্পনা চৌধুরী স্বর্ণা । স্বর্ণা যে আমার জীবনে দুঃখের বন্যা দিয়ে চলে যাবে সে কথা কে জানতো! তার আবেগময়ী কথায় আমি মেতে উঠি । পড়াশোনা শেষ করে আমি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে যোগদান করি সাভার শাখায়। সোনালী ব্যাংকে যোগদান করার কয়েক মাসের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়ে যায়।  বিয়ের পরে মন্ত্রণালয়ে একটি চাকরি হয় আমার কিন্তু স্বর্ণা যোগদান করতে বাধা সৃষ্টি করে। এমন কাজ যে কেন করেছিল তখন না বুঝলেও পরে অবশ্য বুঝেছিলাম। আমাকে স্বর্ণা বুদ্ধি দিলো, আমার ব্যাংক থেকে সে ঋণ নিয়ে বড় কোম্পানী খুলবে। তার সাথে তার বাবা মা ভাই কাজ করবে। কোম্পানী ভালো পজিশনে দাঁড়িয়ে গেলে আমাকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে কোম্পানীর এমডি পদ নিতে হবে। আমি ওর কথায় রাজি হলাম না। কথায় আছে, রাজা শাসন করছে রাজ্য , রাজাকে শাসন করছে রানি। আমিও শাসিত হলাম আমার স্ত্রীর দ্বারা। অবশেষে কর্তৃর ইচ্ছায় কর্ম হলো। কোম্পানী হলো, ঋণ পাশ হলো। সব হলো। একদিন বাড়িতে এসে শুনি আমার স্ত্রী বিদেশে গেছে। সাথে তার বাপ-মা সবাই ।আমাকে ফাঁদে ফেলানো হয়েছে। পরে দেখি আমার নামে কারিকারি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। অবশেষে সাংবাদিক লেগে গেলো আমার পেছনে। আমার বিচার হলো, দশ বছর জেল।
দশ বছর জেল খেটে আমি নিঃস্ব হয়ে কারাগার থেকে বের হলাম। কোথায় যাবো, কী করবো কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। অতীতের কথা মনে পড়ে, নিজেকে খুব অপরাধী মনে হতে লাগলো। কেমন যেন মনে হলো রুনার সাথে আমি অন্যায় করেছি। ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। এরপর বিদায় নেবো এই পৃথিবী নামক  কারাগার থেকে। জানি এতদিনে রুনা তার সংসার পেতে বসেছে। আমারই মত হয়তো সেও ভুলে গেছে যে, তার জীবনে শুফম নামের কোন একজন প্রেমিক পুরুষ ছিল। হয়তো গিয়ে দেখবো, সে তার বাচ্চাকাচ্চা স্বামীর সংসার নিয়ে খুব ব্যস্ত আছে। আমাকে আর চিনতে পারছে না। অনেক কথা বলার পরে হয়তো চিনবে।
গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পশ্চিম আকাশে সূর্য রক্তিম লাল আভা নিয়ে ডুবে যাচ্ছে। গ্রামের মাটিতে পা রাখলাম । নির্মল মৃদু হাওয়ায় আমার হৃদয় জুড়িয়ে গেলো। মনে হচ্ছে এই বুঝি আমি নতুন জীবন ফিরে পেলাম। আমি কৃষক শুফম, মাঠে থেকে কাজ সেরে বাড়ি ফিরছি । আমার স্ত্রী রুনা আমার গোসলের জন্য টিওবয়েল থেকে পানি তুলে আমার জন্য অপেক্ষা করছে । কখন আসবে প্রাণের স্বামী, কখন আসবে প্রাণের স্বামী ! যাই হোক এসব আমার কল্পনা । যা আর কখনো বাস্তবে রূপ নেবে না।



আমাদের সেই সালাসপুর গ্রাম আর সালাসপুর নেই। তার বুকেও এসেছে পরিবর্তন। কাঁচা মেঠো রাস্তা হয়ে গেছে পাকা। গ্রামে ছনের ছাউনির ঘরের পরিবর্তে টিনের কিংবা বিল্ডিংয়ের ঘর উঠেছে। পরিবর্তন। সব পরিবর্তন। আমার পক্ষে আর আহমেদ আলির বাড়ি খুঁজে পাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পথে অনেকের সাথে দেখা হলো, মনে হলো কেউ চিনতে পারেনি। চিনবে কেমনে! সেই শুফম আর আজকের শুফমের মধ্যে রাতদিন তফাৎ।
দূরে একটি ছোট্ট ছেলেকে দেখতে পেলাম, খেলা করছে । ওকে ডাক দিলাম। কাছে আসলো ও।
আহমেদ আলির বাড়ি চেনো? আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম।
কোন আহমেদ আলি ? ছেলেটি আমাকে জিজ্ঞাসা করলো।
আমি তো অবাক। এখন কী বলি!
পাশ দিয়ে একজন মাঝ বয়সী মানুষ যাচ্ছিল। সে হয়তো আমাদের কথা ‍শুনতে পেয়েছে। ওনি ছেলেটিকে মাথায় থাপ্পর দিয়ে বললো, ব্যাংকারের বাড়ি নিয়ে যা ।
ছেলেটি আগে আগে আর আমি ওর পিছু পিছু চললাম ।
আহমেদ আলি আমার দাদা। আমার বাবা মা নৌকা ডুবিতে অনেক বছর আগেই মারা গেছেন। বড় হয়েছি দাদার কাছেই। তিনিও মারা গেছেন আমি যখন কলেজে পড়ি। থাকার মধ্যে ছিল এক সৎ দাদি। জানি না তিনি কেমন আছেন। তার কাছেই যাচ্ছি। তার কাছ থেকে রুনাকে খুঁজে বের করে, রুনার ঠিকানায় গিয়ে ক্ষমা চেয়ে মুক্তি নেবো এই পৃথিবী থেকে।
কিছু দূর হাঁটার পরে ছেলেটি আমাকে নিয়ে ঢুকে পড়লো একটি বাড়িতে। খালা খালা করে চিৎকার দিয়ে বাড়িটাকে মাথায় করে তুললো ছেলেটি। তখন সন্ধ্যার আজান পড়ছে।
রান্নাঘরে রান্না ফেলে রেখে একটি মেয়ে বেরিয়ে এসে বললো , কীরে মদনা এত ডাকছিস কেন?
ছেলেটি আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বললো, দেখ তো কাকে নিয়ে এসেছি?



আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মেয়েটি তার চোখের জল আর ধরে রাখতে পারলো না। পাহাড়ের বুক চিরে যেমন ঝর্ণার পানি পড়ে নদীর বুকে ঠিক তেমনি করে তার চোখের জল ঝরতে লাগলো।
তার কাছে একটু  এগিয়ে যেতেই সে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সেই ছেলেটি চিৎকার করে বলে উঠলো, রুনা খালার স্বামী শুফম ব্যাংকার বাড়ি ফিরছে, রুনা খালা তারে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে।

আমিও আবেগ ধরে রাখতে পারলাম না। দুচোখের জলে ভেসে হয়ে গেলাম একাকার।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটোগল্প:সুভা