কনে দেখায় সামাজিক উদাসীনতা

200
Advertisement

 কনে দেখায় সামাজিক উদাসীনতা

লেখক না হওয়া সত্ত্বেও আমার এহেন লিখা দেখিয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অনেক বিজ্ঞজন যে বিদ্রুপস্বরে কমেন্ট বক্সে উত্তাপ ছড়াইতে পারেন কিংবা মনে মনে ‘কী সব ছাইপাঁশ  লিখিয়াছে’ বলিয়া বিরক্ত হইবেন সেই বিষয়ে আমার বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। সে যাই হউক না কেন, আমার কথাগুলি না বলিয়া আমি নিস্তার পাইতেছি না।

এই যে কন্যার পিতা বিশ বাইশটি  বৎসর আদর ভালোবাসা দিয়া লালন-পালন করিয়া অন্তরের যত আবেগ অনুভূতি সকলই উপেক্ষা করিয়া কথিত সুপাত্রের হস্তে কন্যা সম্প্রদান করিয়া থাকেন, এইটা যেনো জগৎ সংসারের এক অবিচ্ছেদ্য রীতি। আর আমাদের ভগ্নিরা বিশ-বাইশ বৎসরের চিরচেনা গণ্ডি পার হইয়া সম্পূর্ণ অচেনা একটা পরিবেশে প্রবেশ করিয়া নিজেকে ডাঙ্গায় আটকিয়া পড়া মাছের মত ছটফট করিতে থাকেন। আধুনিককালে অনেক কন্যাই তাহাদের পছন্দসই ছেলেকে বিবাহ করিয়া সুখের সংসার গড়িতেছেন তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই।


কথা এতটুকুতে সীমাবদ্ধ থাকিতে পারিত। কিন্তু মূলকথা প্রকাশ্যে আনিবার জন্যই এই কথাগুলির সূত্রপাত। মূল কথা হইল সংসারকে একটা ধর্ম হিসেবেই বিবেচনা করা যায়। বাংলার চিরাচরিত প্রথা হইল কন্যা কোনমতে যদি এসএসসি পাস করিয়ে ফেলে তারপর হইতেই তাহার বিবাহের জন্য পিতা-মাতা উদগ্রীব হইয়া সুপাত্রের সন্ধান করিতে থাকেন। অতঃপর প্রতিষ্ঠিত কোনো পাত্রের সহিত বিবাহের কথাবার্তা শুরু হইলে পাত্রপক্ষ যখন কনের বাড়িতে উপস্থিত হয়, তখন কনেকে ভালো করিয়া সাজাইয়া লম্বা একটা ঘোমটা দিয়া অতিশয় মার্জিত বানাইয়া তাম্বুলপাত্র হস্তে গুটিগুটি পায়ে পাত্রপক্ষের সম্মুখে উপস্থিত করা হয়। তাহার পর কিছু কিছু বাক্য বিনিময়ের পর কন্যাকে পছন্দ হইলে কন্যা ও পাত্রকে কিছুক্ষণ সময়ের জন্য তাহাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার এবং গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করিবার কিংবা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবার  সুযোগ প্রদান করিয়া থাকেন। প্রস্থানকালে পাত্রীর হস্তে পাঁচশ/হাজার টাকা গুজিয়া দিয়া তাহারা পাত্রীকে উদ্ধার করিয়া থাকেন। অতঃপর কিছুদিনের মধ্যে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে সকল প্রকার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করিয়া থাকেন। এইখানে পূর্ব-পরিচিত হউক বা নাই হউক, দুইজনে মিলিয়া এমন অনেক কিছুতেই ঐকমত্যে আসিতে হয় যাহা দুইজনের কেহই পূর্বে কল্পনা করিত না।

এইখানে সহধর্মিনী মনের ক্যানভাসে তুলিতে রঙ মিশাইয়া চিত্রকর্ম আঁকিবার পরিবর্তে মনের ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় মরিচ, হলুদ আর হরেক রকম মসলা মিশাইয়া হরেক পদের- রকমারি স্বাদের তরকারি রান্না করিয়া স্বামীর সামনে পরিবেশন করা যদি তাহার কর্ম ভাবিয়া থাকে, তবে ধর্মজ্ঞান তাহার কিঞ্চিৎ বলিয়া মানিয়া লওয়া ব্যতীত আর কিছু ভাবিবার সুযোগ নাই। পক্ষান্তরে, এইটাও ধ্রুব  সত্য বলিয়া অনাদিকাল ধরিয়া প্রচলিত যে, পত্নীকে সরল মনে ভালোবাসিয়া অত্যধিক মাত্রায় আবেগী হইয়া মনের কথা বলিয়া ফেলিলে সেই পতির কপালে কতটা দুর্ভোগ অপেক্ষা করিতেছে তাহা ওই পতি ঘুণাক্ষরেও টের পাইবে নাহ। শুধু অঙ্গারের মতো জ্বলিয়া পুড়িয়া নিঃশেষ হইয়া যাইতে যাইতে বারংবার ইহাই বলিতে থাকিবে যে,

‘তোমাকে আমি ভালোবাসিয়াছি

যুগ ধরিয়া,

সেই তুমিই ধরিয়াছ ভালোবাসার

লাগাম টানিয়া।’

সে যাহাই হউক, এইবার বর্তমান বাস্তবতায় আসি। কনে দেখিবার প্রাক্কালে আমরা কিছু মার্জিত রুচির কথা চিন্তা করিলে মন্দ হয় না। কনে দেখিতে যাইয়া যেহেতু কনেকে কিছু একটা দিতেই হইবে বলিয়া সমাজে প্রচলিত, তাহা হইলে মার্জিত কোনো উপহার সামগ্রীর কথা ভাবিলে মন্দ হয় না। আমরা বাঙালিরা জাতিগতভাবেই ভোজন রসিক। কাহারো বাড়িতে দাওয়াত ছাড়াও যদি কেহ উপস্থিত হয়, তাহা হইলে তাহাকে যতটুকু সম্ভব আপ্যায়ন করার মানসিকতা আমাদের যথেষ্ট আছে বলিয়াই প্রমাণিত। কিন্তু মার্জিত রুচিবোধ সম্পর্কে আমরা যথেষ্ট সচেতন নই।

লেখা:  আল-আমিন, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।

আরও দেখুন> অপরিচিতা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর